আটটি কুকুরছানার মৃত্যু: রাষ্ট্র, সমাজ ও বিবেকের সামনে এক অমোচনীয় প্রশ্ন- অমানবিকতার অন্ধকারে সমাজের বিবেক কোথায়?

পাবনার ঈশ্বরদীতে আটটি নিরীহ কুকুরছানা হত্যার ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় অপরাধ নয়—এটি আমাদের সমাজের মানবিক বিবেকের সামনে এক নির্মম আয়না। যেখানে মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থানকে সভ্যতার প্রাথমিক চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়, সেখানে শিশু-প্রাণীকে বস্তাবন্দি করে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যা করার মতো অমানবিক আচরণ কেবল অপরাধ নয়; এটি মানুষের মানসিক ক্রুরতার নগ্ন প্রকাশ। সমাজের প্রান্তিক ও অসহায় প্রাণী আজও আমাদের দেশে আইনের সুরক্ষার জন্য যুদ্ধ করে বেঁচে আছে—এ ঘটনাটি তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

এই ঘটনার পর রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্রুত সাড়া দেওয়া একদিকে যেমন আশার সঞ্চার করে, অন্যদিকে আমাদের বাস্তবতার নির্মমতাও প্রকাশ করে। প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯ রয়েছে, জেলা-উপজেলায় প্রাণিসম্পদ কার্যালয় রয়েছে, সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে—তবুও কেন একজন নারী নির্দ্বিধায় আটটি ছানাকে ব্যাগে ভরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারেন? কেন তিনি মনে করলেন, এমন কাজের কোনো পরিণতি হবে না? এর উত্তর আমাদের সমাজেই লুকিয়ে আছে—যেখানে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে এখনও গুরুত্বহীন, “তুচ্ছ” বা “বিরক্তিকর বিষয়” হিসেবে দেখা হয়।

প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার ফোন করে ঘটনাকে সরাসরি ‘‘অমানবিক’’ বলে মন্তব্য করেছেন। এটি নিছক প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, সামাজিক বোধের অবক্ষয়, এবং বিশেষ করে সরকারি আবাসন ব্যবস্থার অভ্যন্তরে এমন কাণ্ড ঘটানো—এসবই সরকারের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বাধ্য। এতেই স্পষ্ট, মানবিক দায়িত্ব কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তা আর ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

মামলা হয়েছে—এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা সামগ্রিকভাবে কতটা মানবিক? আইন প্রয়োগ হলো, আসামি কোয়ার্টার ছাড়লেন, তদন্ত দল এল—সবই প্রশাসনিক কাঠামোর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু সমাজের বিবেক কি জেগেছে? আমরা কি বুঝতে পেরেছি, প্রাণহানির ঘটনাকে কেবল ‘‘একটা কুকুরের ঘটনা’’ হিসাবে অবজ্ঞা করলে মানুষ হিসেবে আমাদের অবস্থান কত নিচে নেমে যায়?

অভিযুক্ত নিশি আকতার দাবি করেছেন, তিনি ছানাগুলোকে পুকুরে ফেলেননি, কেবল ব্যাগে ভরে পুকুরপাড়ে রেখে এসেছিলেন। এই যুক্তি কি মানবিকতা বা আইনের আদালতে টিকতে পারে? শিশু-প্রাণীর জীবনকে এমন অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে যাওয়া নিজেই কি হত্যার সমান নয়? মানুষ যখন মনে করে হত্যা করতে না হলেও মৃত্যু নিশ্চিত এমন অবস্থায় কোনো জীবনকে ফেলে আসা দোষ নয়—তখনই নিষ্ঠুরতার জন্ম হয়।

এ ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের পর দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। এমন ক্ষোভ সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক—কারণ মানবিক প্রতিক্রিয়া সমাজকে বদলাতে পারে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এনিমেল রাইটস কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসেছেন। প্রশাসনও দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু এই ক্ষোভ কত দিনের? আমরা কি পরবর্তী বানর, বিড়াল বা গরুর নির্যাতনের ভিডিও দেখলে একইভাবে বিচলিত হবো? নাকি আবার অভ্যাসগত চুপ থাকা শুরু হবে?

যারা সরকারি কোয়ার্টারে থাকেন, তারা জানেন—এই আবাসিক এলাকাগুলো রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের প্রতীক। সেখানে বসবাসকারীদের প্রতিটি আচরণ সরকারের ভাবমূর্তি বহন করে। আর সেই আবাসিক এলাকাতেই যদি অসহায় প্রাণীর ওপর নির্মমতা ঘটে, তবে রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল অপরাধ নয়—এটি প্রশাসনিক দায়িত্ব লঙ্ঘনও বটে। তাই অভিযুক্ত পরিবারকে কোয়ার্টার ছাড়ার নির্দেশ—এটিও এক অর্থে মানবিক অবস্থানের ঘোষণা।

এই ঘটনায় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা মামলা করেছেন, উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন, মহাপরিচালক সরাসরি তদারকি করছেন—এসবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু দেশের প্রতিটি মানুষকে যদি প্রাণীর ন্যূনতম অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা না যায়, তবে আইন যতই কঠোর হোক, মানবিকতা বিলীনই থাকবে।

আটটি কুকুরছানা কেবল প্রাণী ছিল না—তারা ছিল মাতৃত্বের ছায়ায় থাকা শিশুপ্রাণ। তাদের কান্না কেউ শোনেনি, কিন্তু তাদের মৃত্যুর ছবি সারাদেশকে কাঁপিয়েছে। এই কাঁপুনি যেন থেমে না যায়, ভুলে না যায়, ম্লান না হয়।

এই ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি আমাদের সামনে প্রশ্নের ঝড় তুলে দিয়েছে— আমরা কি সত্যিই মানুষ?
আমরা কি সত্যিই সহানুভূতিশীল সমাজ? আমরা কি সত্যিই অসহায় জীবনের পাশে দাঁড়াতে পারি?

কুকুরছানা হত্যার এই নির্মম অধ্যায় আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সচেতনতার বিপ্লব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং শিক্ষার পরিবর্তন। আগামী প্রজন্মকে আমরা কেমন সমাজ উপহার দেব—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এসব ছোট ছোট, কিন্তু গভীরভাবে মানবিক ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়ায়।

এ দেশ প্রাণী হত্যার দেশে পরিণত হোক—এটাই কি আমরা চাই? না, আমরা চাই মানবিক বাংলাদেশ—যেখানে ছোট্ট প্রাণীর জীবনও মূল্যবান, যেখানে নিষ্ঠুরতা নয়, সহমর্মিতা আমাদের পরিচয়।
এই একটি ঘটনা যেন পরিবর্তনের প্রারম্ভ হয়—সেটাই এখন জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *