তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন রাজনীতিতে সুবাতাসের প্রত্যাশা

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে জমে থাকা রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে। বহুদিন ধরে যার অপেক্ষায় ছিলেন দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা, অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রত্যাবর্তন নয়; এটি একটি দীর্ঘ নির্বাসিত অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বহন করে।


২০০৮ সালে চিকিৎসার প্রয়োজনে লন্ডনে গমন করার পর থেকে প্রায় ১৭ বছর তারেক রহমান দেশের বাইরে ছিলেন। এই সময়কালে বাংলাদেশের রাজনীতি বহু ঘাত-প্রতিঘাত, দমন-পীড়ন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে গেছে। বিএনপি নেতৃত্বশূন্যতার অভিযোগের মুখে পড়লেও বাস্তবে দলটি দীর্ঘ সময় ধরে তারেক রহমানের নির্দেশনা ও কৌশলের ওপর নির্ভর করেই রাজনীতি পরিচালনা করেছে। এখন তাঁর সরাসরি উপস্থিতি দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস বাড়াবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন পর্যবেক্ষকেরা।


বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য আরও গভীর। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকায় বিরোধী রাজনীতির মূল কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী সমমনা জোট। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির কৌশল নির্ধারণ, মাঠের রাজনীতি ও ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


এদিকে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতাও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর শারীরিক অবস্থার কারণে কার্যত দলের প্রধান নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা বিএনপির জন্য একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে বড় দায়িত্ব। নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, তাঁর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দলটি নতুন উদ্দীপনা পাবে এবং সারাদেশে ধানের শীষের পক্ষে নতুন করে জনসমর্থন সংগঠিত হবে।


তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে দমন-পীড়ন ও মামলার ভারে। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কারাবরণ ও নির্যাতনের স্মৃতি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ফিরে এসে তিনি কীভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল করবেন—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।


সব মিলিয়ে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। এটি যদি প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে সংলাপ, সংস্কার ও গণতান্ত্রিক চর্চার পথে এগোয়, তবে দেশের রাজনীতিতে সত্যিই এক ধরনের সুবাতাস বইতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রত্যাবর্তন কেবল আবেগের ঢেউয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনায় রূপ নেয়।

লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *