কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধিঃ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর গৌরবজনক ভূমিকা রয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার রাইফেল নিয়ে আনসার সদস্যরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনীর ৬৭০ জন শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ থেকে আমি তাদের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।
বুধবার সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর -সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছিলো।
দেশে এক অস্থিতিশীল এবং অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। দেশে গণতন্ত্র পুনঃ প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
এরই অংশ হিসেবে গ্রাম ও নগরপর্যায়ে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী-ভিডিপি এবং আনসার বাহিনী একীভূত হয়ে এই বাহিনীর কাঠামো আরও শক্তিশালী, দক্ষ এবং কার্যকর করে তলায় হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষকের এই দূরদর্শী পদক্ষেপই আনসার ও ভিডিপিকে আজকের বহুমাত্রিক, জনসম্পৃক্ত ও গণপ্রতিরক্ষায় সক্ষম বাহিনীতে পরিণত করার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
এরপর খালেদা জিয়া সরকারের সময় ১৯৯৫ সালে আনসার-ভিডিপি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই বাহিনী স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো থেকে একটি স্বতন্ত্র শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে, যা এই বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলেই আজকের আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি গণমুখী প্রতিরক্ষা শক্তি এবং প্রান্তিক সক্ষমতার উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যূত্থান পরবর্তী সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের সকল থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানেও এই বাহিনী ভূমিকা রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের পাশাপাশি আনসার ও ভিডিপি সদস্যগণ সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও সক্রিয় অবদান রাখছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে ৪৭টি আনসার ব্যাটালিয়নের মধ্যে ১৬টি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়োজিত। বাহিনীর ৫২ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ওবিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে।
এই বাহিনীর ১৩ হাজারেরও বেশি হিল আনসার ও হিল ভিডিপি সদস্যরা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি জোরদারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। একইসঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি পুরুষ ও একটি মহিলা ভিডিপি প্লাটুন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমসহ নানা সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করছে। ফলে বাহিনীটি কেবল নিরাপত্তা রক্ষা নয়, সামাজিক পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আনসার ভিডিপি নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশিপ্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করছে যা ইতিবাচক। ‘সঞ্জীবন প্রকল্পের’ মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক এবং ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণ সহায়তা প্রদান এবং কারিগরি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটেছে।

AVJOBS অর্থাৎ Ansar & VDP Job PortaL সফটওয়্যার এবং AI application ব্যবহার করে দেশীয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগও সময়োপযোগী। একইসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রক্রিয়াধীন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়ে আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ, সদস্যদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বই আমার বিশ্বাস।
তারেক রহমান বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, 6G ওয়েল্ডিংসহ বহুমাত্রিক ও চাহিদাভিত্তিক আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। এসব উদ্যোগ সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একই সঙ্গে, এ ধরনের দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সদস্যদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করছে এবং বাহিনীকে ক্রমান্বয়ে একটি কার্যকর Human Capital Development Platform-এ রূপান্তরিত করছে। আমি মনে করি, এ ধরণের উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতা দেশে বিদেশে আনসার ও ভিডিপির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপি বর্তমানে একটি নির্ভরযোগ্য “First Responder” স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। একইসঙ্গে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মতোপরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যগণ টেকসই উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছেন বলে আমি মনে করি।
পাশাপাশি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আনসার-ভিডিপির সাফল্যও প্রশংসনীয়। ৫ম,৬ষ্ঠ ও ৭ম বাংলাদেশ গেমসেপরপর ৩ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০০৪ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’ অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া আয়োজন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে বর্তমান সরকার দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ৩৭৯ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
খেলাধুলার বিভিন্ন ইভেন্টে যেসব খেলোয়াড়গণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলছেন, একটি বেতন কাঠামোর আওতায় এনে বর্তমান সরকার তাদেরকে স্পোর্টস কার্ড প্রদান করেছে। আপনারা নিঃসন্দেহে জেনেছেন, আনসার ভিডিপির ১৫ জন ক্রীড়াবিদকেও বর্তমান সরকার স্পোর্টস কার্ড প্রদান করেছে।
আনসার এবং ভিডিপি বাহিনীর কাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ‘ আনসার ব্যাটালিয়ন বিধিমালা, ২০২৬;
‘ভিডিপি প্রবিধানমালা, ২০২৬; অঙ্গীভূত আনসার বিধিমালা, ২০২৬ এবং আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা, ২০২৬ - এর খসড়া প্রণয়নের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
একইসঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে এই বাহিনীর কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করতে উপজেলা আনসার প্রবিধানমালা ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং গভীর দেশপ্রেমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক সামাজিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর বিভিন্ন কর্মসূচি ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।