বাগমারা (রাজশাহী) প্রতিনিধি:
রাজশাহীর বাগমারা'য় হিন্দু সম্প্রদায়ের নারায়ণ ভবানী (৫৫) নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদার দাবিতে মারপিট ও নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগে তাঁতীদল নেতার নবাব হোসেন ওরফে বাচ্চু (৩০) পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। বাগমারা থানার পুলিশ রাতভর অভিযান চালিয়ে নওগাঁর মান্দা এলাকা থেকে বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ভোরে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া তাঁতীদল নেতার নাম নবাব হোসেন ওরফে বাচ্চু (৩০)। সে উপজেলার গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের চাঁইসাড়া গ্রামের মুনসুর রহমানের ছেলে। জাতীয়তাবাদী তাঁতীদলের গোবিন্দপাড়া ইউনিয়ন শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
দুপুরে তাঁকে চাঁইসাড়া গ্রামের নির্যাতনের শিকার নারায়ণ ভবানীর মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হবে। তবে উপজেলা তাঁতীদল নবাব হোসেনকে দলীয় নেতা অস্বীকার করলে কেন্দ্রীয় কমিটি স্বীকার করে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। এর আগের মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা না দেওয়াতে চাঁইসাড়া গ্রামের নারায়ণ ভবানীর ওপর হামলা চালিয়ে আহত করা হয়।
লোকজন তাঁকে আহত অবস্থায় নামের ওই ব্যক্তিকে উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে ভর্তি করে। ওই গ্রামের সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা তাঁতীদল নেতাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে থানা চত্ত্বরে অবস্থান নেন। পুলিশের পক্ষে মামলা নিয়ে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে থানা ত্যাগ করেন।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের চাঁইসাড়া গ্রামের বাসিন্দা নারায়ন ভবানী ( নারায়ন চন্দ্র) নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে সপ্তাহ খানেক আগে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন তাঁতীদলের নেতা নবাব হোসেন।
ওই গ্রামে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে। না দিলে সমস্যা হবে বলে জানান। তবে তিনি টাকা দিতে অপারগতা জানান। এদিকে মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২ টার দিকে নারায়ন ভবানী গ্রামের এক চালকল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তাঁতিদলের নেতা নবাব হোসেন গতিরোধ করেন। তাঁকে কেন পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়নি এ নিয়ে কৈয়ফিয়ত চান। এক পর্যায়ে তিনি (নবাব) ক্ষুব্ধ হয়ে সেখানেই মারপিট করে নারায়ন ভবানীকে আহত অবস্থায় ফেলে চলে যান। পরে লোকজন উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
ঘটনাটি জানাজানি হলে গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক নারী ও পুরুষ এর প্রতিবাদে ২০ কিলোমিটার দূরে বাগমারা থানায় আসেন। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, তাঁতিদল নেতাকে গ্রেপ্তার ও নিজেদের নিরাপত্তার দাবি জানান। পুলিশ মামলা গ্রহণ, গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিলে দুপুর আড়াইটায় তাঁরা থানা চত্ত্বর ত্যাগ করেন। রাতে নারায়ণ ভবানী বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেন চাঁইসাড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।
তবে নবাব যাতে দ্রুত ছাড়া না পায় সে দাবি জানায়। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নবাব হোসেন ওরফে বাচ্চু গত বছরের ৫ আগস্টের পর বেপরোয়া হয়ে পড়েন। তাঁর বাড়ি চাঁইসাড়া গ্রামের মাঝামাঝিতে। আশপাশে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ১০০ পরিবারের বসবাস। হিন্দু পাড়ায় তিনি প্রভাব বিস্তার করেন। ওই গ্রামের নিপেন্দ্রনাথ মণ্ডল জানান, কিছু দিন আগে তাঁর পুকুর থেকে মাছ মেরে নিয়েছে। যুগেন্দ্রনাথ জানান, তাঁর বাড়ি থেকে ভয় দেখিয়ে ধান নিয়ে গেছে। হিন্দু পাড়ায় দুই হাতে দুই ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঘুরে ভীতির সৃষ্টি করে। তবে তাঁর চাঁদা নেওয়ার পরিমাণ কম। সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। তবে পাঁচ- সাত হাজার টাকা দিলেই রক্ষা পাওয়া যায়।
চাঁইসাড়া গ্রামের যোগেন্দ্রনাথ দাস বলেন, দুই মাস আগে ১০-১২ জন ছেলেপেলে নিয়ে বাড়িতে এসে মব তৈরি করে ১০ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন। এরকম শতাধিক অভিযোগ করেন হিন্দুপাড়ার লোকজন। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বাগমারা উপজেলা শাখার সভাপতি বিশ্বনাথ প্রামাণিক বলেন, তাঁরা এই ঘটনার নিন্দা জানান।
দ্রুত সময়ে গ্রেপ্তার করাতে আমরা খুশি। স্থানীয় বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তাঁরা নিরাপত্তার বিষয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।স্থানীয়রা জানান, নবাব হোসেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। গত ৩১ জুলাই গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের মাড়িয়া কলেজ মাঠে আয়োজিত তাঁতীদলের কর্মীসভায় অংশ নেন তিনি। ওই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডিএম জিয়াউর রহমান।
মঞ্চের সামনে বসে থাকতে দেখা যায় নবাব হোসেনকে। ওই সভায় তাঁতীদলের গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় করে দেওয়া হয়।ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপির উপজেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, এর আগে লোকজন তাঁকে ( নবাব) ধারাল অস্ত্রসহ ধরে সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে তুলে দিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে এই ধরনের অনেক অভিযোগ রয়েছে।
এই বিষয়ে তাঁতীদলের বাগমারা উপজেলা শাখার আহ্বায়ক মামুনুর রশিদ মামুন ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, নবাব হোসেন দলের কেউ নন, কর্মীসভায় নাম প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে। কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
তবে তাঁতীদলের কেন্দ্রীয় কমিটি এক বিজ্ঞপ্তিতে নবাব হোসেন ওরফে বাচ্চুকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল কালাম ও সদস্য সচিব হাজি মজিবুর রহমানের স্বাক্ষর করা চিঠিতে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পাশাপাশি তাঁকে দেখা মাত্র পুলিশে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটি করে স্থায়ী বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পরেই নবাব হোসেন গা ঢাকা দেন। পুলিশের একাধিক দল তাঁকে আটকের চেষ্টা চালায়। ঘন ঘন নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকেন নবাব হোসেন। পরে তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় নওগাঁর মান্দা এলাকার কালীনগর এলাকা থেকে ভোরে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ দাঙ্গা হাঙ্গামার অভিযোগ রয়েছে।